১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ (বিবিনিউজ) : ইয়েমেনের হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইরত সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট বুধবার ইসলাম ধর্মের পবিত্র নগরী মক্কাকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ করেছে। এ ঘটনায় মুসলিম বিশ্বজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে এবং অঞ্চলজুড়ে চলমান সংঘাত আরও গভীর হয়েছে।
ইরান-সমর্থিত হুথি ও সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাতে রিয়াদও জড়িয়ে পড়েছে।
হুথিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করেছে এবং লোহিত সাগরে দেশটির জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে।
রিয়াদ থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
গত সপ্তাহের আকস্মিক অভিযানে গোষ্ঠীটি ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের পুরোটা এবং বাব আল-মান্দাব প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নেয়। বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে কৌশলগত হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সৌদি তেল রপ্তানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব জলপথটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
সৌদি আরবের মক্কা নগরীর দিকে যাওয়া হুথিদের একটি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি দ্রুতই ‘মিথ্যা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে হুথিরা। প্রতি বছর লাখো মুসল্লি মক্কায় হজ ও ওমরাহ পালনে যান।
হুথিদের রাজনৈতিক দপ্তরের সদস্য হাজেম আল-আসাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘মক্কা লক্ষ্য করে হামলার দাবি একটি পুরোনো ও জীর্ণ মিথ্যা। এর আগেও এটি ব্যবহার করা হয়েছে এবং এখন আর কেউ এতে প্রতারিত হয় না।’
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট পাল্টা জবাব দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। তারা বলেছে, পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তা একটি ‘রেড লাইন’।
জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকির এক্সে শেয়ার করা এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘দুই পবিত্র মসজিদ ও হজযাত্রীদের নিরাপত্তা একটি রেড লাইন। সন্ত্রাসী হুথি মিলিশিয়ার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে জোটের যৌথ বাহিনী কমান্ড কোনো দ্বিধা করবে না।’
৫৭টি মুসলিম দেশের জোট অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (ওআইসি) এ হামলার নিন্দা জানিয়েছে।
ইয়েমেন সীমান্তবর্তী সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলসহ মক্কায় সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে মঙ্গলবার সংক্ষিপ্ত সতর্কতা জারি করে রিয়াদ।
ফেব্রুয়ারিতে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মক্কায় এটিই ছিল প্রথম সতর্কতা। ইয়েমেন থেকে ছোড়া একের পর এক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে ১৩ জন আহত হওয়ার একদিন পর এসব সতর্কতা জারি করা হয়।
জুলাইয়ে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়। বহু বছর ধরে উত্তর ইয়েমেনের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে আসা হুথিরা তখন ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে বড় ধরণের অভিযান শুরু করে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, আরব উপদ্বীপের সবচেয়ে দরিদ্র দেশটিতে সংঘাতের কারণে সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ৮২ হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে সড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে।
জাতিসংঘে ইয়েমেনের স্থায়ী প্রতিনিধি আবদুল্লাহ আল-সাদি বলেন, ইয়েমেনিরা তাদের ‘ভূখণ্ডের প্রতিটি ইঞ্চিতে জাতীয় প্রতিষ্ঠান পুনঃপ্রতিষ্ঠার’ জন্য লড়াই করছে। তিনি হুথিদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান।
‘বৈরী ও চরমপন্থি’
গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে হুথিদের অভিযানের পর লোহিত সাগরে অবাধ নৌ চলাচলের আহ্বান জানিয়েছে সৌদি আরব ও মিসর।
সৌদি আরবের কার্যত শাসক যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি মঙ্গলবার হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব প্রণালী দিয়ে ‘নৌ চলাচলের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার’ আহ্বান জানান। মিসরের প্রেসিডেন্টের দপ্তর এ তথ্য জানিয়েছে। বাব আল-মান্দাব লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
২০২২ সাল থেকে স্থবির থাকা ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ নতুন করে শুরু হওয়ায় রিয়াদ দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে তৎপর হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম গত সপ্তাহে জানায়, সৌদি যুবরাজ ব্যক্তিগতভাবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে মার্কিন হস্তক্ষেপের অনুরোধ করেছিলেন। তবে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়।
হুথিরা বলেছে, সৌদি জাহাজ ছাড়া বাব আল-মান্দাব প্রণালীতে নৌ চলাচলের জন্য কোনো হুমকি নেই।
তবে এই জলপথে যেকোনো হামলা জাহাজ পরিচালনাকারীদের কাছে রুটটিকে কম আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে।
লোহিত সাগর সুয়েজ খালের প্রবেশদ্বার হওয়ায় প্রণালীতে বিঘ্ন ঘটলে মিসরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক আয়ের জন্য কায়রো এই খালের ওপর নির্ভরশীল।
২০২৩ সালে হুথিরা প্রথম লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা শুরু করার আগের সময়ের তুলনায় বর্তমানে সুয়েজ খালের আয় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
হুথিরা জানায়, গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে ইসরাইলের যুদ্ধের সময় ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেই ওই হামলা শুরু করা হয়েছিল।
মঙ্গলবার কাতার সতর্ক করে বলেছে, বাব আল-মান্দাব বন্ধ হয়ে গেলে ভয়াবহ পরিণতি হবে। দেশটি বলেছে, এটি ‘পুরো বিশ্বের জন্য বিপর্যয়কর’ হবে।
হুথিরা বিশ্বের শীর্ষ অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক সৌদি আরবের তেল অবকাঠামোকেও লক্ষ্যবস্তু করেছে। এতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের সীমা ছাড়িয়ে যেতে ভূমিকা রেখেছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট বলেছে, ‘দেশটি সার্বভৌমত্ব রক্ষায়’ তারা হামলাগুলোর কঠোরভাবে মোকাবিলা করবে। এই ‘বৈরী ও চরমপন্থি তৎপরতা’ প্রতিরোধে তারা ‘প্রয়োজনীয় সব ধরণের অভিযানগত ব্যবস্থা’ নেবে।
হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি মঙ্গলবার বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় সৌদি আরব ইয়েমেনে ৫২টি বিমান হামলা চালিয়েছে। স্কুল ও সেতুসহ বেসামরিক বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে এসব হামলা চালানো হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তবে রিয়াদের হামলা গোষ্ঠীটির অগ্রযাত্রা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে।
এক মার্কিন কর্মকর্তা মঙ্গলবার এএফপিকে জানান, হামলার মুখে থাকা সৌদি বাহিনীর সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও পরিকল্পনা সহায়তা জোরদারে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক টাস্কফোর্স কাজ করছে।
